বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৬:১৩ এএম
শেয়ার করুন:

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু প্রশ্ন থাকে, যা উচ্চস্বরে উচ্চারিত না হলেও একটি জাতির মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আজকের দিনে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুমের আড্ডায় সবচেয়ে হতাশাজনক যে বাক্যটি শোনা যায়, তা হলো ভোট দিয়ে কী হবে?
আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ হতাশা মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভয়াবহতম ধ্বসের শব্দ। এটি কেবল একটি নির্বাচনের প্রতি অনীহা নয় বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস টুটে যাওয়ার এক করুণ উপাখ্যান। কিন্তু সাহসের সাথে খুব কম মানুষই প্রশ্ন তোলেন—এই সর্বগ্রাসী অনাস্থা একদিনে তৈরি হলো কীভাবে? এই দীর্ঘমেয়াদী নাটকের নেপথ্য কারিগর কারা?
ভোটের আগেই ফল নির্ধারণের এই ধারণা কোনো অলৌকিক বা আকস্মিক ঘটনা নয়। এর শিকড় প্রোথিত আছে আমাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস ও ক্ষমতার পালাবদলের রক্তাক্ত অধ্যায়ে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০—দীর্ঘ একনায়কতন্ত্র ও সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, বুলেটের জোর যার, ব্যালট তার।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইলেও, ক্ষমতার মোহ রাজনীতিবিদদের অন্ধ করে দেয়। যার ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি, কীভাবে নির্বাচনের সংজ্ঞাকেই বদলে ফেলা হয়েছে। বিজয়ী হওয়ার জন্য এখন আর জনমতের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় একটি নিশ্ছিদ্র ‘নীলনকশা’ বা ব্লু-প্রিন্টের।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আধুনিক যুগে ভোট চুরির পদ্ধতিতেও এসেছে বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন। আগের মতো এখন আর ভোটের দিন ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের প্রয়োজন পড়ে না। এখন ম্যানেজ করা হয় পুরো প্রক্রিয়াটিকে। প্রশাসন, পুলিশ এবং আমলাতন্ত্র যাদের কাজ ছিল জনগণের সেবা করা, তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে দলীয় ক্যাডারে।
ভোটের ফলাফল এখন নির্ধারিত হয় ভোটকেন্দ্রে নয়, বরং ক্ষমতার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ড্রয়িংরুমে, নির্বাচনের অনেক আগেই। বিরোধী দলকে মাঠছাড়া করা, মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করার মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়, যেখানে সাধারণ ভোটাররা আগে থেকেই জানেন—বিজয়ী কে হতে যাচ্ছে। এই ‘জানা ফলাফল’ দেখার জন্য লাইনে দাঁড়ানোকে মানুষ তাই নিছক সময় নষ্ট মনে করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রহসনের নির্বাচনে কারা লাভবান হয়? অবশ্যই তারা, যারা জনসমর্থন হারিয়ে ক্ষমতার জোরে গদিতে টিকে থাকতে চায়। লাভবান হয় সেই সুবিধাবাদী আমলা ও অলিগার্ক শ্রেণি, যারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে দেশের সম্পদ লুটে নেওয়ার অবাধ লাইসেন্স পায়। আর বিদেশি শক্তি?
তারাও তখন গণতন্ত্রের নীতিনৈতিকতা ভুলে, নিজেদের স্বার্থে ‘স্থিতিশীল’ কিন্তু ‘অগণতান্ত্রিক’ সরকারের সাথে হাত মেলায়। এই ত্রিমুখী আঁতাতের যুপকাষ্ঠে বলি হয় সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ০৫ জানুয়ারি ২০২৬