সাভারের রহস্যময় ‘সিরিয়াল কিলার’
সাভারের বাতাস এখন ভারী। পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারটি পুলিশ ফিতে দিয়ে ঘিরে রেখেছে। কিন্তু মানুষের মনে যে আতঙ্কের দাগ লেগেছে, তা কি সহজে মুছবে? পৃথিবীর নিয়ম বড় অদ্ভুত। এখানে সুস্থরা যখন নিশ্চিন্তে ঘুমায়, তখন পাগলেরা জেগে থাকে। আর সেই জাগরণ মাঝে মাঝে বড় ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৬:৩৬ এএম
শেয়ার করুন:

আব্দুল্লাহ জমাদ্দার জনি, ঢাকা
সাভার জায়গাটা বেশ অদ্ভুত। ঢাকা শহরের খুব কাছে, আবার দূরত্বের হিসেবে বেশ খানিকটা দূরে। এখানে মানুষের কোলাহল আছে, কারখানার ধোঁয়া আছে, আর আছে অসংখ্য গল্প। কিছু গল্প আলোর, কিছু অন্ধকারের।
তবে সাভার মডেল থানার ঠিক পেছনে
যে গল্পটা গত সাত মাস ধরে রচিত হয়েছে, তা শুনলে বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়। মনে
হয়, আমরা আসলে কেউ নিরাপদ নই। থানা থেকে মাত্র ত্রিশ গজ দূরে একটি পরিত্যক্ত পৌর
কমিউনিটি সেন্টার। দোতলা দালান।
একসময় এখানে বিয়ের সানাই বাজত,
মানুষের হাসি-কান্নায় মুখর থাকত। এখন সেখানে শুধুই জঞ্জাল, শ্যাওলা আর ঘুটঘুটে
অন্ধকার। এই অন্ধকারের একজন বাসিন্দা ছিল। তার নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট। নামে
সম্রাট, কিন্তু কাজে সে ছিল সাক্ষাৎ যমদূত। দিনের আলোয় সে ভবঘুরে, আর রাতে এক
ঠান্ডা মাথার খুনি।
আলোর নিচেই গাঢ় অন্ধকার
প্রদীপের নিচে যে অন্ধকার থাকে,
সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু সেই অন্ধকার যে এতটা গভীর হতে পারে, মানুষ তা কল্পনাও
করতে পারেনি। থানার সীমানা প্রাচীরের ওপাশেই গত সাত মাসে একে একে ছয়টি খুন হয়েছে।
ভাবা যায়? পুলিশ স্টেশনের বাতিগুলো সারা রাত জ্বলে, আর তার আড়ালেই একটি পরিত্যক্ত
ভবনে মানুষের প্রাণ যায়, লাশ পোড়ে।
সম্রাট ধরা পড়ার পর জানা গেল তার ভয়াবহ সব কর্মকাণ্ডের কথা। সে তার শিকারদের গলায় ফাঁস দিয়ে মারত। তারপর লাশের পরিচয় গোপন করতে আগুন ধরিয়ে দিত। মানুষের পোড়া মাংসের গন্ধ নাকি খুব উৎকট হয়। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এত কাছে থেকেও কেউ সেই গন্ধ পেল না। বাতাস কি তবে অন্য কোনো দিকে বইছিল? নাকি শহরের মানুষের নাকে এখন আর লাশের গন্ধ লাগে না?
কে এই সম্রাট?
সম্রাটকে স্থানীয়রা চিনত ‘পাগল’
হিসেবে। সে থানার গেটের আশেপাশে ঘুরঘুর করত। এলোমেলো চুল, নোংরা পোশাক। বিড়বিড় করে
নিজের মনে কথা বলত। মাঝে মাঝে পুলিশের দিকে তাকিয়ে স্যালুট দিত। পুলিশ সদস্যরা
হয়তো করুণার চোখে তাকাতেন, কেউবা ধমক দিয়ে সরিয়ে দিতেন।
কিন্তু এই ‘পাগল’ বেশটা ছিল তার
নিখুঁত ছদ্মবেশ। অপরাধবিজ্ঞানে একটা কথা আছে—সবচেয়ে নিরাপদ লুকানোর জায়গা হলো
চোখের সামনে। সম্রাট সেটাই করেছিল। সে জানত, পাগলের কোনো শত্রু নেই, পাগলের ওপর
কেউ নজর রাখে না।
গ্রেপ্তারের পর সে পুলিশকে নিজের নাম বলেছিল মশিউর রহমান খান সম্রাট, বাবার নাম মৃত সালাম। ঠিকানা দিয়েছিল সাভার ব্যাংক কলোনি। পুলিশ সরল বিশ্বাসে সেই তথ্যই নথিতে তুলেছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো ভিন্ন তথ্য।
জানা গেছে, তার আসল নাম সবুজ শেখ।
বাড়ি মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানার মৌছামান্দ্রা গ্রামে। বাবার নাম পান্না শেখ। একজন
খুনি পুলিশের চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা বলল, আর পুলিশ সেটা যাচাই না করেই বিশ্বাস
করল—এটাকে কি শুধু অবহেলা বলা যায়? নাকি ব্যবস্থার ত্রুটি?
শিকার এবং শিকারি
সম্রাটের শিকার কারা? সমাজের সেই
সব মানুষ, যাদের আমরা ‘বাতিল’ বলে গণ্য করি। ভবঘুরে নারী, ছিন্নমূল যুবক, কিংবা
ঘরপালানো কিশোরী। এদের কেউ খোঁজ রাখে না। এরা হারিয়ে গেলে থানায় জিডি হয় না,
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপা হয় না। সম্রাট তার নিজস্ব দর্শনে বিশ্বাসী ছিল। সে মনে
করত, এই মানুষগুলো সমাজের আবর্জনা। সে শুধু সাফাইকর্মী হিসেবে কাজ করছে।
তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামের মেয়েটির কথাই ধরা যাক। মেয়েটি হয়তো একটু আশ্রয়ের আশায়, একটু খাবারের লোভে সেই পরিত্যক্ত দালানে গিয়েছিল। সম্রাট তাকে কী বলেছিল? ‘এসো, এখানে খুব শান্তি?’
মেয়েটি কি জানত, এই শান্তি আসলে
অনন্ত ঘুমের শান্তি? সোনিয়াকে হত্যার পর সম্রাট তার লাশ পুড়িয়ে দেয়। সিসিটিভি
ফুটেজে দেখা যায়, সম্রাট খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লাশ কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে। যেন
কোনো ভারী বস্তা ফেলছে ডাস্টবিনে।
সিসিটিভির সেই হাড়হিম করা দৃশ্য
রহস্যের জট খুলল যখন একটি
সিসিটিভি ফুটেজ সামনে এলো। ফুটেজে দেখা গেল, সম্রাট একা নয়, তার এই মৃত্যুপুরীতে
মাঝে মাঝে অন্যরাও আসত। সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের আগে এক সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা
পড়েছিল সে। সেখানে এক নারীর সঙ্গে তাকে দেখা গিয়েছিল। সেই নারীই ছিল তার পরবর্তী
শিকার।
ফুটেজে দেখা যায়, সম্রাট একটি লাশ
কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো ভয় নেই। আছে
এক ধরণের পৈশাচিক প্রশান্তি। এই দৃশ্য দেখে তদন্তকারী কর্মকর্তাদেরও গা শিউরে
উঠেছিল।
পুলিশের ভূমিকা: প্রশ্ন এবং উত্তর
সাভারের এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা
নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জোরালোভাবে। একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না
করার শর্তে বলেছেন, ‘আসামির নাম-ঠিকানা যাচাই না করাটা পেশাদারিত্বের চরম অভাব।’
সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সম্রাট একেক সময় একেক কথা বলছে। কখনো বলছে সে অনৈতিক কাজ দেখলেই খুন করত, আবার কখনো বলছে নারীদের প্রতি তার এক ধরণের ক্ষোভ ছিল। তার কথার সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—সাত মাস ধরে থানার নাকের ডগায় একটা ‘কসাইখানা’ চলল, আর গোয়েন্দারা তার কোনো খবর পেল না?
আমাদের দায়
সম্রাট এখন রিমান্ডে। ১৬৪ ধারায়
জবানবন্দি দেওয়ার কথা চলছে। সে হয়তো সব স্বীকার করবে, কিংবা নতুন কোনো গল্প
ফাঁদবে। কিন্তু সাভারের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—আমরা আসলে কতটা
উদাসীন।
আমাদের চারপাশেই হয়তো এমন অনেক
সম্রাট ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাই। নাকে রুমাল চেপে ভাবি, ‘আহা,
পাগল লোক!’ কিন্তু সেই পাগলের ছদ্মবেশের আড়ালে যে এক ভয়ংকর খুনি লুকিয়ে নেই, তার
নিশ্চয়তা কে দেবে?
সাভারের বাতাস এখন ভারী। পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টারটি পুলিশ ফিতে দিয়ে ঘিরে রেখেছে। কিন্তু মানুষের মনে যে আতঙ্কের দাগ লেগেছে, তা কি সহজে মুছবে? পৃথিবীর নিয়ম বড় অদ্ভুত। এখানে সুস্থরা যখন নিশ্চিন্তে ঘুমায়, তখন পাগলেরা জেগে থাকে। আর সেই জাগরণ মাঝে মাঝে বড় ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
নবোদয়/ এজেডজে/ জেডআরসি/ ২০
জানুয়ারি ২০২৬