রোহিঙ্গা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং জ্বালানি অর্থনীতি
গণহত্যার সাফাই: আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের দাবি—২০১৭ সালের অভিযান ছিল 'সন্ত্রাস দমন', যদিও ৭ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার বাস্তবতা সেই দাবিকে নস্যাৎ করছে।
সংখ্যালঘু নিয়ে উদ্বেগ: নির্বাচনের ঠিক আগেই দেশে ১৫ জন হিন্দু সংখ্যালঘু হত্যার খবর নিয়ে আরআরএজি (RRAG)-এর প্রতিবেদনে গভীর উদ্বেগ।
জ্বালানি সমীকরণ: বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কমায় বাংলাদেশে এলএনজি (LNG) আমদানি বাড়ার সম্ভাবনা—অর্থনীতির জন্য যা 'মন্দের ভালো' সংবাদ।
বুধবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৬:৩৭ এএম
শেয়ার করুন:

আদিত্য আজাদ, ঢাকা
১৭ জানুয়ারী, ২০২৬: বিশ্ব মিডিয়ায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
ঢাকা : রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং জ্বালানি অর্থনীতি—এই তিন ভিন্ন ইস্যুতে গত ২৪ ঘণ্টায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের শুনানি থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ আরও তীব্র হয়েছে।
হেগে গণহত্যা শুনানি: মিয়ানমারের দাবি ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এবিসি নিউজ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান শুনানিতে মিয়ানমার সরকার ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা দমন অভিযানে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ওই সময়কার অভিযান ছিল ‘সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম’।
তবে আদালতে বাদীপক্ষ গাম্বিয়ার উপস্থাপিত তথ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার উপস্থিতি এই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে গড়ে ওঠা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোই মিয়ানমারের বক্তব্যের বিপরীত বাস্তবতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ।
শরণার্থী সংকট ও ‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম’
আল জাজিরা ও এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিজেতে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে বেড়ে উঠছে একটি প্রজন্ম, যাদের বড় অংশ শিক্ষা ও টেকসই জীবিকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসা এবং প্রত্যাবাসনের কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় এই সংকট বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে বলে বিশ্ব গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম। দ্য ইকোনমিক টাইমস এবং মানবাধিকার সংগঠন আরআরএজি (RRAG)-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যেই গত ১ ডিসেম্বর থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশে অন্তত ১৫ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হত্যার শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং নির্বাচনকে ঘিরে লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতার প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে এবং নির্বাচনী পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি বাজারে স্বস্তির আভাস
মানবাধিকার ও নিরাপত্তা উদ্বেগের বিপরীতে অর্থনৈতিক খবরে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। রয়টার্সের বাজার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর দাম কমতির দিকে থাকায় বাংলাদেশ আবারও স্পট মার্কেট থেকে আমদানি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতে শিল্পখাত সাময়িকভাবে উপকৃত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যে বৈশ্বিক দামের ওপর কতটা নির্ভরশীল, সেই বাস্তবতাও নতুন করে সামনে আনছে।
দ্বৈত বাস্তবতায় বাংলাদেশ
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ এখন একটি দ্বৈত বাস্তবতার প্রতীক। একদিকে, রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের প্রশ্নে মানবিক অবস্থান ও ন্যায়বিচারের দাবিদার রাষ্ট্র; অন্যদিকে, নিজের ভেতরে নির্বাচনকালীন সহিংসতা ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাওয়া একটি দেশ।
বিশ্ব পর্যবেক্ষকদের মতে, অর্থনৈতিক স্বস্তির কিছু খবর থাকলেও মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলোই আগামী দিনে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।
নবোদয়/ এএ/ জেডআরসি/ ১৭ জানুয়ারি ২০২৬